উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দীর্ঘদিন ধরেই নাভিশ্বাস উঠেছে দেশের মধ্যবিত্তের। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখনও স্বাভাবিক হয়নি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে, বাড়িভাড়া ও যাতায়াত খরচও ঊর্ধ্বমুখী। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা কিছুটা বাড়ানো হলেও সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ আরও বাড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ী নেতারা।
বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি স্বস্তিদায়ক মনে হলেও একইসঙ্গে ৫ শতাংশের সর্বনিম্ন কর ধাপ বাতিল করে— ১০ শতাংশের নতুন প্রাথমিক করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির যে সুবিধা পাওয়া যেতো, তার বড় অংশই হারিয়ে যাচ্ছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা, যারা নিয়মিত কর দেন এবং সীমিত আয়ের মধ্যেই সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করার চেষ্টা করেন।
করমুক্ত সীমা বাড়লেও কেন বাড়ছে কর?
প্রস্তাবিত কর কাঠামো অনুযায়ী আগামী দুই অর্থবছরে প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয় করমুক্ত থাকবে। এরপরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, তার পরের ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অবশিষ্ট আয়ের ওপর করহার থাকবে ৩০ শতাংশ।
কাগজে-কলমে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও ৫ শতাংশের কর ধাপ তুলে দেওয়ার কারণে করদাতাদের বড় অংশকে সরাসরি দ্বিগুণ হারে কর দিতে হবে। ফলে যাদের আয় করযোগ্য সীমার সামান্য ওপরে, তাদের করের বোঝা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা আরও বেশি বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। কিন্তু বাজেটে সেই বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায়নি।
সৎ করদাতাদের জন্য আরেক ধাক্কা
মধ্যবিত্তের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের একটি বিষয় হলো— বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত কমিয়ে দেওয়া। বর্তমানে সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস, জীবনবিমা, অবসরভাতা তহবিলসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা ১৫ শতাংশ হারে কর রেয়াত পান। নতুন বাজেটে এই হার কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইসঙ্গে সর্বোচ্চ রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে যারা নিয়মিত সঞ্চয় করেন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য বিনিয়োগ করেন, তারা আগের তুলনায় কম কর ছাড় পাবেন। অর্থাৎ সরকার একদিকে সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার কথা বললেও অন্যদিকে কর সুবিধা কমিয়ে সেই প্রণোদনাকে দুর্বল করেছে। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি এক লাখ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে একজন করদাতা আগের তুলনায় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা কম কর সুবিধা পাবেন। এতে মধ্যবিত্তের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা কমে যেতে পারে।
কার ওপর কতটা বাড়বে করের চাপ
এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাসিক প্রায় ৭৪ হাজার টাকা আয় করা একজন চাকরিজীবীর বার্ষিক করযোগ্য আয় দাঁড়াবে প্রায় ৯ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। বিদ্যমান কাঠামোতে তার কর দায় ছিল প্রায় ৫ হাজার টাকা। নতুন ব্যবস্থায় তা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭ হাজার ৪৫৪ টাকা। অর্থাৎ করভার বাড়ছে প্রায় ৪৯ শতাংশ।
মাসিক প্রায় ৯৮ হাজার টাকা আয় করা একজন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কর দায় ১৯ হাজার ৫০৪ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ হাজার ৭৫৪ টাকায় পৌঁছাবে। এ ক্ষেত্রে করভার বৃদ্ধি প্রায় ৫৮ শতাংশ।

প্রতিনিধির নাম
।।