বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা সময়ের স্রোতে হারিয়ে যায়। কিছু ঘটনা সংবাদপত্রের পাতায় কয়েকদিন আলোচিত হয়, তারপর ধীরে ধীরে বিস্মৃতির আড়ালে চলে যায়। কিন্তু কিছু ঘটনা থেকে যায় রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে এক অনিবার্য প্রশ্ন হয়ে। সাহাদাত হোসেন শ্যামলের ঘটনা তেমনই একটি ঘটনা।
২০১৯ সালের ১৪ মার্চে পুলিশের গুলিতে আহত হওয়ার পর সাত বছর পেরিয়ে গেছে। এই সাত বছরে শ্যামল শুধু একটি গুলিবিদ্ধ শরীর নয়, বরং আমাদের বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থার দীর্ঘ ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। সম্প্রতি হাইকোর্ট তাঁর চিকিৎসার জন্য দুই লাখ টাকা ১ মাসের মধ্যে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং কেন তাঁকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে রুল জারি করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ।
এই ঘটনার সবচেয়ে নির্মম দিক সম্ভবত গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি নয়; বরং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার প্রকৃতি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার অন্যতম কারণ ছিল একটি গুলি ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ১৫০ টাকার ক্ষতি করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের হিসাবের খাতায় গুলির মূল্য নির্ধারিত হয়েছিল, কিন্তু যে তরুণের পায়ে সেই গুলি ঢুকে তার স্বাভাবিক জীবন, কর্মক্ষমতা, শিক্ষা, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎকে বিপর্যস্ত করে দিল, তার ক্ষতির মূল্য নির্ধারণ কিংবা পুনর্বাসনের জন্য রাষ্ট্রের তৎপরতা ছিল অত্যন্ত সীমিত। এখানেই রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও মানবিক দায়বদ্ধতার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একজন নাগরিকের জীবনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বেআইনি প্রয়োগ কতটা ভয়াবহ প্রভাব ফেলতে পারে, শ্যামলের ঘটনা তার একটি নির্মম উদাহরণ। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ চিকিৎসা, শারীরিক যন্ত্রণা, কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা -সবকিছুই তাঁকে বহন করতে হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীকালে তাঁকে মিথ্যা মামলার হয়রানিও সহ্য করতে হয়েছে এবং এখনো সেই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।। অর্থাৎ একজন ভুক্তভোগী নাগরিককে শুধু গুলির ক্ষত নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নানা স্তরে অবহেলা ও প্রতিকূলতার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়েছে।